Showing posts with label আত্মজৈবনিক কবিতা. Show all posts
Showing posts with label আত্মজৈবনিক কবিতা. Show all posts

সরলরেখার জন্য - জগন্নাথ চক্রবর্তী

সামান্য একটা সরলরেখার জন্য মাথা খুঁড়ছি
পাচ্ছি না।
পৃথিবীতে কোথাও একটা সরলরেখা নেই।

আকাশ অপরাজিত-নীল কিন্তু গোলাকার,
দিগন্তও চক্রনেমিক্রম।
নদী আঁকাবাঁকা, পাহাড় এবড়ো-খেবড়ো
হ্রদ চ্যাপটা, উপকূল বুকে-হাঁটা সরীসৃপের মতো খাঁজ-কাটা।
কুকুরের লেজ কুণ্ডলী, হরিণের শিং ঝাঁকড়া
গোরুর খুর দ্বিধা, আর গ্রান্ডট্রাংক রোড উধাও কিন্তু এলোমেলো।
সৃষ্টিতে সরলরেখা বোধহয় এখনও জন্মায়নি
যত দাগ, সব হয় ডিম, নয় নারকোল, কলার মোচা
বৃত্ত, উপবৃত্ত ইত্যাদি;
একটাও সোজা নয়।

দারিদ্র্যরেখা – তারাপদ রায়

আমি নিতান্ত গরীব ছিলাম, খুবই গরীব।
আমার ক্ষুধার অন্ন ছিল না,
আমার লজ্জা নিবারণের কাপড় ছিল না,
আমার মাথার উপরে আচ্ছাদন ছিল না।
অসীম দয়ার শরীর আপনার,
আপনি এসে আমাকে বললেন,
না, গরীব কথাটা খুব খারাপ,
ওতে মানুষের মর্যাদা হানি হয়,
তুমি আসলে দরিদ্র।

অপরিসীম দারিদ্র্যের মধ্যে আমার কষ্টের দিন,
আমার কষ্টের দিন, দিনের পর দিন আরশেষ হয় না,
আমি আরো জীর্ণ আরো ক্লিষ্ট হয়ে গেলাম।
হঠাৎ আপনি আবার এলেন, এসে বললেন,
দ্যাখো, বিবেচনা করে দেখলাম,
দরিদ্র শব্দটিও ভালো নয়, তুমি হলে নিঃস্ব।

দীর্ঘ নিঃস্বতায় আমার দিন রাত্রি,
গনগনে গরমে ধুঁকতে ধুঁকতে,
শীতের রাতের ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে,
বর্ষার জলে ভিজতে ভিজতে,
আমি নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়ে গেলাম।
আপনার কিন্তু ক্লান্তি নেই,
আপনি আবার এলেন, আপনি বললেন,
তোমার নিঃস্বতার কোনো মানে হয় না,
তুমি নিঃস্ব হবে কেন,
তোমাকে চিরকাল শুধু বঞ্চনা করা হয়েছে,
তুমি বঞ্চিত, তুমি চিরবঞ্চিত।

আমার বঞ্চনার অবসান নেই,
বছরের পর বছর আধপেটা খেয়ে,
উদোম আকাশের নিচে রাস্তায় শুয়ে,
কঙ্কালসার আমার বেঁচে থাকা।
কিন্তু আপনি আমাকে ভোলেননি,
এবার আপনার মুষ্টিবদ্ধ হাত,
আপনি এসে উদাত্ত কণ্ঠে ডাক দিলেন,
জাগো, জাগো সর্বহারা।

তখন আর আমার জাগবার ক্ষমতা নেই,
ক্ষুধায় অনাহারে আমি শেষ হয়ে এসেছি,
আমার বুকের পাঁজর হাঁপরের মতো ওঠানামা করছে,
আপনার উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে
আমি তাল মেলাতে পারছি না।

ইতিমধ্যে আরো বহুদিন গিয়েছে,
আপনি এখন আরো বুদ্ধিমান,
আরো চৌকস হয়েছেন।
এবার আপনি একটি ব্ল্যাকবোর্ড নিয়ে এসেছেন,
সেখানে চকখড়ি দিয়ে যত্ন করে
একটা ঝকঝকে লম্বা লাইন টেনে দিয়েছেন।
এবার বড় পরিশ্রম হয়েছে আপনার,
কপালের ঘাম মুছে আমাকে বলেছেন,
এই যে রেখা দেখছো, এর নিচে,
অনেক নিচে তুমি রয়েছো।

চমৎকার!
আপনাকে ধন্যবাদ, বহু ধন্যবাদ!
আমার গরীবপনার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার দারিদ্র্যের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার নিঃস্বতার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার বঞ্চনার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার সর্বহারাত্বের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আর সবশেষে ওই ঝকঝকে লম্বা রেখাটি,
ওই উজ্জ্বল উপহারটির জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ।

কিন্তু,
ক্রমশ,
আমার ক্ষুধার অন্ন এখন আরো কমে গেছে,
আমার লজ্জা নিবারণের কাপড় এখন আরো ছিঁড়ে গেছে,
আমার মাথার ওপরের আচ্ছাদন আরো সরে গেছে।
কিন্তু ধন্যবাদ,
হে প্রগাঢ় হিতৈষী, আপনাকে বহু ধন্যবাদ!

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


আজি প্রভাতে       প্রভাতবিহগ
        কী গান গাইল রে!
অতিদূর দূর        আকাশ হইতে
       ভাসিয়া আইল রে!
না জানি কেমনে       পশিল হেথায়
       পথহারা তার একটি তান,
    আঁধার গুহায় ভ্রমিয়া ভ্রমিয়া
    গভীর গুহায় নামিয়া নামিয়া
    আকুল হইয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া
       ছুঁয়েছে আমার প্রাণ।

লড়ছি সবাই – শামসুর রাহমান


মিশমিশে ঘোর অন্ধকারে
কনুই দিয়ে ধাক্কা মারে,
রহিম পড়ে রামের ঘাড়ে,
কেউবা দেখি চুপিসারে
অন্য কারুর জায়গা কাড়ে,
পাচ্ছি তা টের হাড়ে হাড়ে।
লাইন থেকে সরছি ক্রমে সরছি।

পরিচয় - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



একদিন তরীখানা থেমেছিল এই ঘাটে লেগে,
         বসন্তের নূতন হাওয়ার বেগে।
      তোমরা শুধায়েছিলে মোরে ডাকি
         পরিচয় কোনো আছে নাকি,
                   যাবে কোন্খানে।
         আমি শুধু বলেছি, কে জানে।
নদীতে লাগিল দোলা, বাঁধনে পড়িল টান,
         একা বসে গাহিলাম যৌবনের বেদনার গান।
                   সেই গান শুনি
         কুসুমিত তরুতলে তরুণতরুণী
                   তুলিল অশোক,
মোর হাতে দিয়ে তারা কহিল, " আমাদেরই লোক।'
                   আর কিছু নয়,
         সে মোর প্রথম পরিচয়।

আমি - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,
                          চুনি উঠল রাঙা হয়ে।
                      আমি চোখ মেললুম আকাশে,
                          জ্বলে উঠল আলো
                               পুবে পশ্চিমে।
                   গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম "সুন্দর',
                               সুন্দর হল সে।
                      তুমি বলবে, যে তত্ত্বকথা,
                                   কবির বাণী নয়।
                          আমি বলব, সত্য,
                                  তাই কাব্য।
                         আমার অহংকার,
                             অহংকার সমস্ত মানুষের হয়ে।
                        মানুষের অহংকার-পটেই
                              বিশ্বকর্মার বিশ্বশিল্প।
                   তত্ত্বজ্ঞানী জপ করছেন নিশ্বাসে প্রশ্বাসে,
                                    না, না, না--
                   না-পান্না, না-চুনি, না-আলো, না-গোলাপ,
                                     না-আমি, না-তুমি।
                   দিকে, অসীম যিনি তিনি স্বয়ং করেছেন সাধনা
                                    মানুষের সীমানায়,
                             তাকেই বলে "আমি'
সেই আমির গহনে আলো-আঁধারের ঘটল সংগম,
                               দেখা দিল রূপ, জেগে উঠল রস।
                          "না' কখন ফুটে উঠে হল "হাঁ' মায়ার মন্ত্রে,
                                  রেখায় রঙে সুখে দুঃখে।
                        একে বোলো না তত্ত্ব;
                          আমার মন হয়েছে পুলকিত
                               বিশ্ব-আমির রচনার আসরে
                                    হাতে নিয়ে তুলি, পাত্রে নিয়ে রঙ।
                                  পণ্ডিত বলছেন--
                             বুড়ো চন্দ্রটা, নিষ্ঠুর চতুর হাসি তার,
                          মৃত্যুদূতের মতো গুঁড়ি মেরে আসছে সে
                                                পৃথিবীর পাঁজরের কাছে।
                                    একদিন দেবে চরম টান তার সাগরে পর্বতে;
                                      মর্তলোকে মহাকালের নূতন খাতায়
                                         পাতা জুড়ে নামবে একটা শূন্য,
                                      গিলে ফেলবে দিনরাতের জমাখরচ;
                                         মানুষের কীর্তি হারাবে অমরতার ভান,
                                               তার ইতিহাসে লেপে দেবে
                                                  অনন্ত রাত্রির কালি।
                             মানুষের যাবার দিনের চোখ
                                  বিশ্ব থেকে নিকিয়ে নেবে রঙ,
                               মানুষের যাবার দিনের মন
                                         ছানিয়ে নেবে রস!
                             শক্তির কম্পন চলবে আকাশে আকাশে,
                                  জ্বলবে না কোথাও আলো।
                               বীণাহীন সভায় যন্ত্রীর আঙুল নাচবে,
                                         বাজবে না সুর।
                               সেদিন কবিত্বহীন বিধাতা একা রবেন বসে
নীলিমাহীন আকাশে
                             ব্যক্তিত্বহারা অস্তিত্বের গণিততত্ত্ব নিয়ে।
                                  তখন বিরাট বিশ্বভুবনে
                             দূরে দূরান্তে অনন্ত অসংখ্য লোকে লোকান্তরে
                               বাণী ধ্বনিত হবে না কোনোখানেই--
                                      "তুমি সুন্দর',
                                    "আমি ভালোবাসি'
                          বিধাতা কি আবার বসবেন সাধনা করতে
                                    যুগযুগান্তর 'রে।
                               প্রলয়সন্ধ্যায় জপ করবেন--
                                           "কথা কও, কথা কও',
                               বলবেন "বলো, তুমি সুন্দর',
                                    বলবেন "বলো, আমি ভালোবাসি'?


_